১৯৫২ থেকে ১৯৭১- অসমাপ্ত স্বপ্নগাথা
ড. আলা উদ্দিন [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস শুধু একটি ভৌগোলিক সীমারেখার সৃষ্টি নয়, বরং এক দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ফসল। ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হলেও বাঙালি জাতির স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি। তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, শুধু ধর্মের ভিত্তিতে একটি জাতি গঠন সম্ভব নয়। ভাষা, সংস্কৃতি এবং নিজস্ব পরিচয় রক্ষার সংগ্রাম শুরু হয় দেশভাগের পরপরই। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল সেই সংগ্রামের প্রথম উজ্জ্বল অধ্যায়, যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে। এই ঐতিহাসিক ধারায় একুশের চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ একই সূত্রে গাঁথা অসাম্প্রদায়িক চেতনা, অধিকার আদায় এবং মাথা নত না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় ধর্মকে প্রধান ভিত্তি ধরে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশ শাসকরা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে উপমহাদেশকে ভাগ করে, যেখানে ধর্মই ছিল একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু পূর্ব বাংলার মানুষ দ্রুতই উপলব্ধি করে যে, এই রাষ্ট্রে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক অধিকার নিরাপদ নয়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয় এবং বাংলা ভাষাকে অবমাননা করে। পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও তাদের ভাষাগত অধিকার অস্বীকার করা হয়। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে প্রতিবাদ। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির পরিচয় এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক। বাঙালিরা বুঝেছিল যে, ভাষা হারালে তাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে।
মাতৃভাষা রক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে রক্ত ঝরে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেক তরুণ প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করে যে, বাঙালি জাতি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না। ভাষা আন্দোলন ছিল শুধু ভাষার অধিকার রক্ষার লড়াই নয়, বরং এটি ছিল বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রথম সংগ্রাম। পাকিস্তানের মতো প্রতাপশালী রাষ্ট্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সরল, অসহায় ও দুর্বল অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি ভাষার অধিকার আদায় করে নিতে সক্ষম হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হতে শেখে। ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক সকল শ্রেণির মানুষ এক হয়ে দাঁড়ায় নিজেদের অধিকার রক্ষায়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ঘটে। এই চেতনাই পরবর্তীতে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে।
একুশের চেতনা থেকে জন্ম নেয় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করে যে, ধর্ম নয়, ভাষা এবং সংস্কৃতিই একটি জাতির প্রকৃত পরিচয়। বাঙালিরা চেয়েছিল এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে সমান মর্যাদা পাবে। একুশের চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িক, যেখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলে মিলে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। এই চেতনাই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির মাঝে যে অভূতপূর্ব অসাম্প্রদায়িক ও সাংস্কৃতিক চেতনার জাগরণ ঘটে, তা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলার রেনেসাঁ রূপে আবির্ভূত হয়।
ভাষা আন্দোলনের পর দীর্ঘ দুই দশক ধরে পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব বাংলাকে কেবলমাত্র সম্পদ আহরণের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে। পাটসহ অন্যান্য রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার বেশিরভাগ খরচ হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে পূর্ব বাংলা ছিল চরমভাবে অবহেলিত। এছাড়াও সামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক প্রশাসনে পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য। এই ধারাবাহিক বঞ্চনা বাঙালিদের মনে স্বাধিকার এবং স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা জাগ্রত করে।
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা দাবি ছিল পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা। ছয় দফা কর্মসূচি বাঙালি জাতির মুক্তির সনদে পরিণত হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় প্রমাণ করে যে, বাঙালি জাতি তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গণতান্ত্রিক রায় মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। এই গণহত্যার জবাবে বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের যে চেতনা জন্ম নিয়েছিল, তা ১৯৭১ সালে পূর্ণতা পায়।
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে এবং দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকল ধর্মের মানুষ একসঙ্গে লড়াই করেছিল। বাঙালি, চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতালসহ সকল জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। অস্ত্রশস্ত্রে শূন্য হাতে কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্রযুবা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের মতো সামরিক শক্তিতে শক্তিমান রাষ্ট্রকে হারিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ করে। এই ঐক্যই ছিল বাংলাদেশের শক্তি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভাষা আন্দোলনের বীজ থেকে জন্ম নেয় মুক্তিযুদ্ধের মহীরুহ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ছিল। এটি কেবল বাংলাদেশ নামক একটি ভূখণ্ডের উৎপত্তির কথা বলে না, বরং ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ প্রণীত দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা প্রতিপাদন করে। ধর্মের ভিত্তিতে যে রাষ্ট্র গঠন করা হয়েছিল, মাত্র চব্বিশ বছরের মাথায় তা ভেঙে আবার দুই ভাগ হয়ে যায়। বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রমাণ করে যে, ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থই জাতি গঠনের প্রকৃত ভিত্তি, ধর্ম নয়। এই ঐতিহাসিক সত্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং অনেক নিপীড়িত জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখায়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এবং সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা- এই চারটি মূলনীতি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। সমাজে এখনো সাম্প্রদায়িক বিভেদ বিদ্যমান। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জমি থেকে উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিপন্থী। অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে এবং ধনী-গরিবের মধ্যে ব্যবধান ক্রমাগত প্রশস্ত হচ্ছে। গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক অধিকার এখনো সকলের জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হয়নি। গ্রাম ও শহরের মধ্যে উন্নয়নের ফারাক বিদ্যমান। নারীরা এখনো সমাজে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার হন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং জবাবদিহির অভাব প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। যে বাঙালি জাতি ১৯৫২ সালে প্রতাপশালী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভাষার অধিকার আদায় করেছিল এবং ১৯৭১ সালে মহা শক্তিধর সামরিক বাহিনীকে মোকাবিলা করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সেই জাতি আজ যেন অগ্রসরতার বদলে স্থবির হয়ে আছে। কখনো কখনো আবার পেছনপানে হাঁটার ঝুঁকিতে পতিত হয়। এটি এই ভূখণ্ডের মানুষের সঙ্গে মানানসই নয়।
ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের সূত্র একই অধিকার আদায়- মর্যাদা রক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছিলেন এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাদের স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ এবং মানবিক বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন পূরণ করা এখনো চলমান প্রক্রিয়া। আবার জাগতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হতে পারে। এরই মাঝে কিন্তু লুকিয়ে আছে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মাহাত্ম্য। একুশে ফেব্রুয়ারি এবং ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বর শুধু স্মরণের দিন নয়, বরং প্রতিজ্ঞার দিন যে, আমরা মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকব।
লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়